বিউটি বোর্ডিংয়ের সেই আড্ডাটা



BDT150.00
BDT200.00
Save 25%

পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং তার সত্তর বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-আড্ডার এক কিংবদন্তি স্থানে রূপ নিয়েছে। আড্ডার সেই সোনালি দিন হয়তো আজ অস্তমিত, কিন্তু কবি-লেখকদের স্মৃতি ও সৃষ্টিতে বিউটি বোর্ডিংয়ের ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়নি মোটেও। এই বইয়ের কিছু কবিতা ও স্মৃতিকথায় ধরা রইল আড্ডামুখর উজ্জ্বল অতীতের অমূল্য রেখাচিত্র।

Quantity


  • Security policy (edit with Customer reassurance module) Security policy (edit with Customer reassurance module)
  • Delivery policy (edit with Customer reassurance module) Delivery policy (edit with Customer reassurance module)
  • Return policy (edit with Customer reassurance module) Return policy (edit with Customer reassurance module)

১৯৪৯ সালে পুরান ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় বিউটি বোর্ডিং। সাত দশকে একটি খাবারের রেস্তোরাঁ এবং ছোটখাটো আবাসিক হোটেল কী করে দেশের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে তার সাক্ষ্য ধরা রইল এই বইয়ে। বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডাবাজরা ক্রমে পরিণত হয়েছেন বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিজগতের বিশিষ্টজনে। তাঁরা যেমন এখানে বসে তাঁদের সৃষ্টিশীলতার পরিসর তৈরি করেছেন তেমনি তাঁদের নিজ নিজ সৃষ্টিতে ভাস্বর হয়েছে বিউটি বোর্ডিংও। এমনই কিছু কবিতা ও গদ্যের সংকলন এই বই, যেখানে পাঠক পাবেন হারানো এক সোনালি সময়ের উজ্জ্বল উদ্ধার এবং পড়তে পড়তে আনমনে গেয়ে উঠবেন ‘বিউটি বোর্ডিংয়ের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই...’।

Data sheet

Title
বিউটি বোর্ডিংয়ের সেই আড্ডাটা
Author
পিয়াস মজিদ
Publisher
প্রথমা প্রকাশন
ISBN
9789849436508
Publishing year
2020
Binding
Hard binding
Language
বাংলা
Number of page
103

Reviews

সোনালি সময়ের উজ্জ্বল উদ্ধার

| 02/09/2020

প্রিয় কোন পুরাতন বই যেন এই<br /> বিউটি বোর্ডিং; যেন পুরোনো দিনের<br /> কোন গান, শ্রাবণের বৃষ্টিধারা যেন<br /> নির্জন একটি বাড়ি বিউটি বোর্ডিং।<br /> মহাদেব সাহা তাঁর কবিতায় বিউটি বোর্ডিংকে এভাবেই উপস্থাপন করেছিলেন। পুরোনো এই বোর্ডিংটি যেন এক মহান কিতাব, যার পৃষ্ঠা আর হরফে লুকিয়ে আছে কত শত গল্প, ইতিহাস আর সৃষ্টির রহস্যকথা। পুরোনো কিতাবের মতোই স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যহীন এবং প্রায় পরিত্যক্ত একটি দালানবাড়ি আমাদের শিল্পসংস্কৃতির চর্চার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, যা পরিণত হয় প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক যাত্রার আঁতুড়ঘরে, অসংখ্য গল্প-কবিতা-উপন্যাসের প্রসবস্থলে।<br /> এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান আর ইতিহাস নিয়ে ‘বিউটি বোর্ডিংয়ের সেই আড্ডাটা’ নামী প্রামাণ্য গ্রন্থটি বাঙালি পাঠকদের উপহার দিয়েছেন পিয়াস মজিদ। মূলত এটি একটি সংকলন; বিউটিকে উপলক্ষ করে সাতটি কবিতা, দশটি স্মৃতিগদ্য আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রের মলাটবদ্ধরূপ।<br /> শুরুতে দেওয়া পিয়াস মজিদের ভূমিকাটি বিউটি বোর্ডিং সম্পর্কে স্বচ্ছ ও সমৃদ্ধ একটি ধারণা দেবে পাঠককে। আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ইতিহাসে তার অপরিহার্যতা ও সংশ্লিষ্টতার একটা সংক্ষিপ্ত বয়ান দিয়েছেন। তা ছাড়া মধুর ক্যানটিনের মতো এ জায়গাটিও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর যে চক্ষুশূল ছিল সে বিষয়ে আলাপের অবতারণা করেছেন, যা নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় ইতিহাসে একটি বিশেষ সংযোজন।<br /> বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দেওয়া সাহিত্যিক ও চিন্তকদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা পিয়াস মজিদ তাঁর ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন। চিত্রশিল্পী-অভিনেতা-পরিচালক কে যায়নি সেখানে? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদসহ বিশিষ্ট রাজনীতিবিদদেরও সরব একটা পদচারণ ছিল।<br /> সত্তর বছরে একটি সাধারণ হোটেল কী করে আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়, তারই একটি সাক্ষ্য এই গ্রন্থ।<br /> মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বেও বিউটি বোর্ডিংয়ের বিশেষ সক্রিয়তা ছিল। ফলে এ প্রগতিশীল আড্ডাস্থলকে কায়েমি স্বার্থবাদীরা একবোরেই ভালোভাবে নেয়নি। পাকিস্তান রাষ্ট্র এটিকে নিশ্চিত শত্রু হিসেবেই জ্ঞান করেছে। তার প্রমাণ মেলে ১৯৭১ সালে বিউটি বোর্ডিংয়ে হামলা আর হত্যাযজ্ঞের ঘটনা থেকেই। পিয়াস মজিদের ভাষায়, আড্ডার স্থল কেবল যে ভাত-রুটি-চা-সিগারেট-শিঙাড়া-মিষ্টির গুলতানি নয় বরং অলস আড্ডার মধ্য দিয়ে যে নতুন গতিমান দিনের স্বপ্ন মঞ্জরিত হয়ে ওঠে, তা প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ঠিক অনুধাবন করেছে। এ জন্যই বিউটি বোর্ডিংয়ের স্বত্বাধিকারী প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা এবং মধুর ক্যানটিনের মধুসূদন দে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন।<br /> ‘বিউটি বোর্ডিংয়ের সেই আড্ডাটা’ গ্রন্থের মূলপর্ব শুরু হয়েছে শামসুর রাহমানের ‘বিউটি বোর্ডিং’ শিরোনামের কবিতার মাধ্যমে। এ জায়গাটি নিয়ে তখনকার লেখকেরা কতটা আবেগপ্রবণ আর এ নিয়ে কতটা নষ্টালজিক ছিলেন, তার একটা নমুনা পাওয়া যায় তাতে। অসুস্থ হওয়ার পর বিউটগমনের জন্য কাতর হয়েছিলেন কবি, আক্ষেপে লিখেছেন:<br /> কতকাল, কত দীর্ঘকাল<br /> বিউটি বোর্ডিং থেকে নির্বাসিত আমি। কোনো দিন<br /> আবার সেখানে ছুটে যেত পারব কি<br /> আষাঢ়ের বৃষ্টি আচড়ানো অপরাহ্ণে কিংবা কোন<br /> গনগনে ভাদ্রের দুপুরে?<br /> বিউটি নিয়ে দু–দুটি কবিতা লিখেছেন শামসুর রাহমান। দুটি কবিতাই গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রথমটির শিরোনাম ‘বিউটি বোর্ডিং’ এবং দ্বিতীয়টি ‘সোনালি টেবিল আর রুপালি চেয়ার’। বিউটি বোর্ডিং নিয়ে লেখা আল মাহমুদ, ইমরুল চৌধুরী, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ এবং সানউল হকের কবিতাও সংকলিত হয়েছে। সবারই আবেগ আর স্মৃতিতে বিউটি বোর্ডিং অবস্থান করছে প্রোজ্জ্বল হয়ে। আল মাহমুদ লিখেছেন:<br /> কে যেন সামনে রাখে ধোঁয়া ওড়া প্রহ্লাদের এক কাপ চা<br /> আগের মতোই উষ্ণ, তৃপ্তিময় ওষ্ঠের আরাম<br /> গ্রন্থটিতে সংকলিত হয়েছে বিউটিয়ানদের অগ্রপথিক ও বিউটি-আড্ডার জনক শহীদ কাদরীর স্মৃতিগদ্য। আড্ডাস্থল হিসেবে তিনিই জায়গাটি আবিষ্কার করেছিলেন। বিউটি বোর্ডিংয়ের স্বত্বাধিকারী প্রয়াত তারক সাহার ভাষ্যও তাই ‘বিউটি বোর্ডিংয়ের খুব কাছে থাকতেন শহীদ কাদরী। শহীদ কাদরীই এ জায়গাটা আবিষ্কার করেন। তিনি আসতেন সবার আগে আর যেতেন সবার পরে।’ একে এক তার সঙ্গে যুক্ত হন শামসুর রাহমান, সৈয়দ সামসুল হক ও অন্যরা।<br /> যদিও আগে থেকে সেখানে প্রেস আর সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলার’ অফিস ছিল এবং লেখকদের অল্পস্বল্প চলাচল ছিল। কিন্তু বিউটি বোর্ডিং প্রতিষ্ঠার পর আড্ডাস্থল হিসেবে জায়গাটির আবিষ্কার শহীদ কাদরীর মাধ্যমেই হয়। এটা এমনই এক জায়গায় পরিণত হয়েছিল যে এখানে আড্ডাবাজ লেখকদের সবাই আসতেন। তীর্থস্থানের মতো সৃষ্টিশীলদের এক জরুরি সমাগমস্থল হিসেবে রূপান্তরিত হয়ে যায় স্থানটি।<br /> দ্বিতীয় স্মৃতি গদ্যটি সৈয়দ হকের। বলা চলে তাঁর লেখালেখির উন্মেষকালের সিংহভাগই তিনি বিউটিতে কাটিয়েছেন। বিউটির চায়ের টেবিল ছিল তাঁর লেখার টেবিল। তিনি তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ রচনা বিউটি বোর্ডিংয়ে বসে লিখেছেন। লেখা শেষে বাকিতে ভূরিভোজ তো নিত্য ঘটনা। সৈয়দ হক সে সময়ের একটা বর্ণনা দেন এভাবে: ‘আমি সকাল আটটা নাগাদ এসে বসে যাই লিখতে, ক্রমে ক্রমে আসেন সকলে, তাঁদের হো হো হাসি আর জমজমাট গল্প কোলাহলেও লেখায় আমার ব্যাঘাত ঘটে না, বুদ্ধদেব বসুর “কবিতা” পত্রে ছাপা প্রায় সব কবিতাই বিউটিতে বসে লেখা।’<br /> বেলাল চৌধুরী বিউটি আড্ডার গোড়ার কথা লিখেছেন। পঞ্চাশের দশকে তাঁদের তারুণ্য আর বিউটি বোর্ডিংয়ের তৎকালীন তৎপরতা নিয়ে ভিন্নরকম একটি লেখা যা সংকলনগ্রন্থটির শ্রীবর্ধন ঘটিয়েছে। তাঁরা শিল্প-সাহিত্য নিয়ে কী রকম আড্ডা দিতেন, তার একটা চিত্র খুঁজে পাওয়া যায় বেলাল চৌধুরীর ‘আমাদের যৌবরাজ্যের সৌন্দর্যখীন বিউটি বোর্ডিং’ শিরোনামের রচনায়। তিনি লিখেছেন ‘তা সেদিন বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “কবিতা” পত্রিকার নবতম সংখ্যা সামনে নিয়ে সম্ভবত দুপুর থেকে একটানা রাত দশটা কি সাড়ে দশটা পর্যন্ত আনুমানিক ছ’সাত প্যাকেট সিগারেট, অগণিত কাপের পর কাপ ভর্তি চা-সহযোগে কী যে আড্ডা জমেছিল!’<br /> পঞ্চাশ-ষাটের দশকে যাঁরা বিউটিতে যাওয়া–আসা করতেন, তাঁদের অনেকেই সে সময় বা পরবর্তীকালে খ্যাতিকীর্তির অধিকারী হয়েছেন। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতহাস বিউটিতে রচিত হয়েছে, যা আমাদের ইতিহাস-এতিহ্যের অংশ হিসেবে দীর্ঘকাল থাকবে। আর এসব নিয়েই স্মৃতি রোমন্থন করেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, কায়সুল হক, রণজিৎ পাল, মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ। বিউটির প্রতিষ্ঠা আর এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে লিখেছেন প্রাণেশ সমাদ্দার, প্রতিভা সাহা ও তারক সাহা; এঁদের সবার লেখাই মলাটবদ্ধ হয়েছে সংকলনটিতে।<br /> সত্তর বছরে একটি সাধারণ হোটেল কী করে আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়, তারই একটি সাক্ষ্য এই গ্রন্থ, যা একাধারে বৃহৎ সৃষ্টিশীল গোষ্ঠীর নষ্টালজিকতা এবং সোনালি সময়ের এক উজ্জ্বল স্মৃতি।

সোনালি সময়ের উজ্জ্বল উদ্ধার

| 02/09/2020

প্রিয় কোন পুরাতন বই যেন এই<br /> বিউটি বোর্ডিং; যেন পুরোনো দিনের<br /> কোন গান, শ্রাবণের বৃষ্টিধারা যেন<br /> নির্জন একটি বাড়ি বিউটি বোর্ডিং।<br /> মহাদেব সাহা তাঁর কবিতায় বিউটি বোর্ডিংকে এভাবেই উপস্থাপন করেছিলেন। পুরোনো এই বোর্ডিংটি যেন এক মহান কিতাব, যার পৃষ্ঠা আর হরফে লুকিয়ে আছে কত শত গল্প, ইতিহাস আর সৃষ্টির রহস্যকথা। পুরোনো কিতাবের মতোই স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যহীন এবং প্রায় পরিত্যক্ত একটি দালানবাড়ি আমাদের শিল্পসংস্কৃতির চর্চার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, যা পরিণত হয় প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক যাত্রার আঁতুড়ঘরে, অসংখ্য গল্প-কবিতা-উপন্যাসের প্রসবস্থলে।<br /> এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান আর ইতিহাস নিয়ে ‘বিউটি বোর্ডিংয়ের সেই আড্ডাটা’ নামী প্রামাণ্য গ্রন্থটি বাঙালি পাঠকদের উপহার দিয়েছেন পিয়াস মজিদ। মূলত এটি একটি সংকলন; বিউটিকে উপলক্ষ করে সাতটি কবিতা, দশটি স্মৃতিগদ্য আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রের মলাটবদ্ধরূপ।<br /> শুরুতে দেওয়া পিয়াস মজিদের ভূমিকাটি বিউটি বোর্ডিং সম্পর্কে স্বচ্ছ ও সমৃদ্ধ একটি ধারণা দেবে পাঠককে। আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ইতিহাসে তার অপরিহার্যতা ও সংশ্লিষ্টতার একটা সংক্ষিপ্ত বয়ান দিয়েছেন। তা ছাড়া মধুর ক্যানটিনের মতো এ জায়গাটিও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর যে চক্ষুশূল ছিল সে বিষয়ে আলাপের অবতারণা করেছেন, যা নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় ইতিহাসে একটি বিশেষ সংযোজন।<br /> বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দেওয়া সাহিত্যিক ও চিন্তকদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা পিয়াস মজিদ তাঁর ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন। চিত্রশিল্পী-অভিনেতা-পরিচালক কে যায়নি সেখানে? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদসহ বিশিষ্ট রাজনীতিবিদদেরও সরব একটা পদচারণ ছিল।<br /> সত্তর বছরে একটি সাধারণ হোটেল কী করে আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়, তারই একটি সাক্ষ্য এই গ্রন্থ।<br /> মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বেও বিউটি বোর্ডিংয়ের বিশেষ সক্রিয়তা ছিল। ফলে এ প্রগতিশীল আড্ডাস্থলকে কায়েমি স্বার্থবাদীরা একবোরেই ভালোভাবে নেয়নি। পাকিস্তান রাষ্ট্র এটিকে নিশ্চিত শত্রু হিসেবেই জ্ঞান করেছে। তার প্রমাণ মেলে ১৯৭১ সালে বিউটি বোর্ডিংয়ে হামলা আর হত্যাযজ্ঞের ঘটনা থেকেই। পিয়াস মজিদের ভাষায়, আড্ডার স্থল কেবল যে ভাত-রুটি-চা-সিগারেট-শিঙাড়া-মিষ্টির গুলতানি নয় বরং অলস আড্ডার মধ্য দিয়ে যে নতুন গতিমান দিনের স্বপ্ন মঞ্জরিত হয়ে ওঠে, তা প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ঠিক অনুধাবন করেছে। এ জন্যই বিউটি বোর্ডিংয়ের স্বত্বাধিকারী প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা এবং মধুর ক্যানটিনের মধুসূদন দে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন।<br /> ‘বিউটি বোর্ডিংয়ের সেই আড্ডাটা’ গ্রন্থের মূলপর্ব শুরু হয়েছে শামসুর রাহমানের ‘বিউটি বোর্ডিং’ শিরোনামের কবিতার মাধ্যমে। এ জায়গাটি নিয়ে তখনকার লেখকেরা কতটা আবেগপ্রবণ আর এ নিয়ে কতটা নষ্টালজিক ছিলেন, তার একটা নমুনা পাওয়া যায় তাতে। অসুস্থ হওয়ার পর বিউটগমনের জন্য কাতর হয়েছিলেন কবি, আক্ষেপে লিখেছেন:<br /> কতকাল, কত দীর্ঘকাল<br /> বিউটি বোর্ডিং থেকে নির্বাসিত আমি। কোনো দিন<br /> আবার সেখানে ছুটে যেত পারব কি<br /> আষাঢ়ের বৃষ্টি আচড়ানো অপরাহ্ণে কিংবা কোন<br /> গনগনে ভাদ্রের দুপুরে?<br /> বিউটি নিয়ে দু–দুটি কবিতা লিখেছেন শামসুর রাহমান। দুটি কবিতাই গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রথমটির শিরোনাম ‘বিউটি বোর্ডিং’ এবং দ্বিতীয়টি ‘সোনালি টেবিল আর রুপালি চেয়ার’। বিউটি বোর্ডিং নিয়ে লেখা আল মাহমুদ, ইমরুল চৌধুরী, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ এবং সানউল হকের কবিতাও সংকলিত হয়েছে। সবারই আবেগ আর স্মৃতিতে বিউটি বোর্ডিং অবস্থান করছে প্রোজ্জ্বল হয়ে। আল মাহমুদ লিখেছেন:<br /> কে যেন সামনে রাখে ধোঁয়া ওড়া প্রহ্লাদের এক কাপ চা<br /> আগের মতোই উষ্ণ, তৃপ্তিময় ওষ্ঠের আরাম<br /> গ্রন্থটিতে সংকলিত হয়েছে বিউটিয়ানদের অগ্রপথিক ও বিউটি-আড্ডার জনক শহীদ কাদরীর স্মৃতিগদ্য। আড্ডাস্থল হিসেবে তিনিই জায়গাটি আবিষ্কার করেছিলেন। বিউটি বোর্ডিংয়ের স্বত্বাধিকারী প্রয়াত তারক সাহার ভাষ্যও তাই ‘বিউটি বোর্ডিংয়ের খুব কাছে থাকতেন শহীদ কাদরী। শহীদ কাদরীই এ জায়গাটা আবিষ্কার করেন। তিনি আসতেন সবার আগে আর যেতেন সবার পরে।’ একে এক তার সঙ্গে যুক্ত হন শামসুর রাহমান, সৈয়দ সামসুল হক ও অন্যরা।<br /> যদিও আগে থেকে সেখানে প্রেস আর সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলার’ অফিস ছিল এবং লেখকদের অল্পস্বল্প চলাচল ছিল। কিন্তু বিউটি বোর্ডিং প্রতিষ্ঠার পর আড্ডাস্থল হিসেবে জায়গাটির আবিষ্কার শহীদ কাদরীর মাধ্যমেই হয়। এটা এমনই এক জায়গায় পরিণত হয়েছিল যে এখানে আড্ডাবাজ লেখকদের সবাই আসতেন। তীর্থস্থানের মতো সৃষ্টিশীলদের এক জরুরি সমাগমস্থল হিসেবে রূপান্তরিত হয়ে যায় স্থানটি।<br /> দ্বিতীয় স্মৃতি গদ্যটি সৈয়দ হকের। বলা চলে তাঁর লেখালেখির উন্মেষকালের সিংহভাগই তিনি বিউটিতে কাটিয়েছেন। বিউটির চায়ের টেবিল ছিল তাঁর লেখার টেবিল। তিনি তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ রচনা বিউটি বোর্ডিংয়ে বসে লিখেছেন। লেখা শেষে বাকিতে ভূরিভোজ তো নিত্য ঘটনা। সৈয়দ হক সে সময়ের একটা বর্ণনা দেন এভাবে: ‘আমি সকাল আটটা নাগাদ এসে বসে যাই লিখতে, ক্রমে ক্রমে আসেন সকলে, তাঁদের হো হো হাসি আর জমজমাট গল্প কোলাহলেও লেখায় আমার ব্যাঘাত ঘটে না, বুদ্ধদেব বসুর “কবিতা” পত্রে ছাপা প্রায় সব কবিতাই বিউটিতে বসে লেখা।’<br /> বেলাল চৌধুরী বিউটি আড্ডার গোড়ার কথা লিখেছেন। পঞ্চাশের দশকে তাঁদের তারুণ্য আর বিউটি বোর্ডিংয়ের তৎকালীন তৎপরতা নিয়ে ভিন্নরকম একটি লেখা যা সংকলনগ্রন্থটির শ্রীবর্ধন ঘটিয়েছে। তাঁরা শিল্প-সাহিত্য নিয়ে কী রকম আড্ডা দিতেন, তার একটা চিত্র খুঁজে পাওয়া যায় বেলাল চৌধুরীর ‘আমাদের যৌবরাজ্যের সৌন্দর্যখীন বিউটি বোর্ডিং’ শিরোনামের রচনায়। তিনি লিখেছেন ‘তা সেদিন বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত “কবিতা” পত্রিকার নবতম সংখ্যা সামনে নিয়ে সম্ভবত দুপুর থেকে একটানা রাত দশটা কি সাড়ে দশটা পর্যন্ত আনুমানিক ছ’সাত প্যাকেট সিগারেট, অগণিত কাপের পর কাপ ভর্তি চা-সহযোগে কী যে আড্ডা জমেছিল!’<br /> পঞ্চাশ-ষাটের দশকে যাঁরা বিউটিতে যাওয়া–আসা করতেন, তাঁদের অনেকেই সে সময় বা পরবর্তীকালে খ্যাতিকীর্তির অধিকারী হয়েছেন। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতহাস বিউটিতে রচিত হয়েছে, যা আমাদের ইতিহাস-এতিহ্যের অংশ হিসেবে দীর্ঘকাল থাকবে। আর এসব নিয়েই স্মৃতি রোমন্থন করেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, কায়সুল হক, রণজিৎ পাল, মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ। বিউটির প্রতিষ্ঠা আর এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে লিখেছেন প্রাণেশ সমাদ্দার, প্রতিভা সাহা ও তারক সাহা; এঁদের সবার লেখাই মলাটবদ্ধ হয়েছে সংকলনটিতে।<br /> সত্তর বছরে একটি সাধারণ হোটেল কী করে আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়, তারই একটি সাক্ষ্য এই গ্রন্থ, যা একাধারে বৃহৎ সৃষ্টিশীল গোষ্ঠীর নষ্টালজিকতা এবং সোনালি সময়ের এক উজ্জ্বল স্মৃতি।